আপনার সন্তানকে কেন বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি করাবেন?

যারা যারা সরকারি মেডিকেলে টিকেছেন, তাদেরকে অভিনন্দন, যারা যারা ভর্তি পরীক্ষায় ৪০এর কম মার্ক পেয়েছেন, তাদের উদ্দেশে কিছু লেখার নাই। মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, আনিসুল হকরা পাবলিক পরীক্ষার রেজাল্টের পরের দিন যে কলামখানা লিখে থাকেন, সেটা পড়ে নেবেন। এই লেখাটা মূলত প্রায় পঞ্চাশ হাজার শিক্ষার্থীদের জন্য, যারা সরকারি মেডিকেলে টিকেন নাই কিন্তু “পাশ করেছেন” এবং বেসরকারি মেডিকেল কলেজের মালিক পক্ষের সম্ভাব্য মুরগী হওয়ার অপেক্ষায় আছেন, তাদের অভিভাবকদের জন্য। আপনার সন্তানকে বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি করানোর আগে আরো একবার চিন্তা করুন। গতবছর বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য সরকার ২২ লাখ ৮০ হাজার টাকা ঠিক করে দিয়েছিলো। এই বছর এই অংকটা আরো বাড়বে। যারা বেসরকারি মেডিকেল কলেজে পড়েন, তারা জানেন আইসবার্গের ভাসমান অংশের মতোই এই টাকা হচ্ছে দৃশ্যমান অংশ। এই টাকা দিয়ে কেউই বেসরকারি মেডিকেল থেকে পাশ করে বের হতে পারবেন না। এর বাইরেও নানা ধরণের ফী যুক্ত হয়ে এই খরচ ত্রিশ লাখ পেরোবে।

এখন প্রিয় অভিভাবক, এই ত্রিশ লাখ টাকা দিয়ে আপনার সন্তানের নামের পাশে ডাক্তার লেখার মোহ থেকে বের হয়ে একবার শান্তভাবে চিন্তা করুন।কেনো আপনি তাকে ডাক্তার বানাতে চান। যাবতীয় আদর্শিক বাকোয়াজ আর ছোটবেলার রচনার কথা ভুলে আপনি যদি সৎ হন, আপনি স্বীকার করবেন, স্রেফ স্বচ্ছলতার জন্য, সম্মানের জন্য। এদেশে কালকে যদি কেউ আবিষ্কার করে পালি কিংবা সংস্কৃত পড়ালে প্রচুর টাকা আর সম্মান মিলবে, দলে দলেতো বাচ্চাদের তাই পড়াবেন। সম্মানের কথাতো আপেক্ষিক বিষয়। তারপরও অনলাইনে ডাক্তারদের নিয়ে যে মুখরোচক আলোচনা হয় আর আপনার কাছের ডাক্তার আত্মীয়কে শুনিয়ে শুনিয়ে অধিকাংশ ডাক্তারের নামের আগে যেভাবে কসাই বসিয়ে দেন, তাতে সম্মান কতটুকু আছে, অনুমান করে নিন। বাকী বিষয়টাতে আসি। আপনার আদরের সন্তানকে এতো টাকা খরচ করিয়ে পড়ানোর পরে তার বেতন কতো হবে জানেন?

ছয় বছর আগে যেসব অভিভাবক ঠিক ত্রিশ লাখ টাকা দিয়ে তাদের সন্তানকে ডাক্তারি পড়তে পাঠিয়েছিলেন, বেসরকারি হাসপাতালে তাদের এখন বেতন ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজারের মধ্যে। তিন বছর আগে আমি যখন বের হই, তখনো এই বেতন ছিলো, এখনো এই বেতন। পৃথিবীতে অনেক পরিবর্তন ঘটবে, রোনালদো তার আরো কয়েকটা গার্লফ্রেন্ড পরিবর্তন করবে, হয়তো কোনো এক বৃহস্পতিবার সাউথ আফ্রিকা সেমিফাইনাল জিতে ফাইনালে পৌছে যাবে, হয়তো বাংলাদেশ ক্রিকেট দল থেকে খালেদ মাহমুদ সুজন বিদায় নিয়ে চলে যাবে। সম্ভব, সবই সম্ভব। শুধু একটা ব্যাপার আমি জানি অসম্ভব। সেটা হচ্ছে, বাংলাদেশে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডিউটি ডাক্তার নামক যে অসম্মানের মধ্য দিয়ে তরুণ চিকিৎসকরা যাচ্ছে, তার কোনো পরিবর্তন হবেনা। আগামী তিন বছর পরেও এদের বেতনের তেমন কোনো হেরফের হবেনা। সরকারি মেডিকেলে আমরা যারা পড়ে এসেছি, তাদের জন্য এটা মেনে নেওয়াটা সহজ। কারণ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ছেলে যে টাকা দিয়ে পড়াশোনা করেছে, আমিও মোটামুটি একই খরচে পড়াশোনা করেছি। কষ্টটুকুর কথা আপাতত ভুলে গেলাম। কষ্ট ভুলে যাওয়া অনেক সহজ। কিন্তু মধ্যবিত্ত ( আসলে বেসরকারি মেডিকেলে পড়ুয়া অধিকাংশ ছাত্রই মধ্যবিত্ত পরিবার থেকেই আসে) পরিবারের ত্রিশ লাখ টাকা খরচ করে পড়া চিকিৎসক তরুণের সামনে যে অনিশ্চয়তা পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকে, সেটা উপেক্ষা করা সহজ নয়।

বেসরকারি মেডিকেলে পড়তে থাকা এবং পড়া শেষ করে ডাক্তার হয়ে বের হয়ে পোস্ট গ্রাজুয়েশনের দীর্ঘ বন্ধুর পথে খাবি খেতে থাকা অনেক তরুণের সাথে আমার পরিচয়। এদের মধ্যে অনেকেই প্রচন্ড মেধাবী। অনেকেই কষ্ট করে তাদের এই প্যাশান এবং ভালবাসার পেশাটায় সফলতার জায়গা তৈরি করে নিচ্ছেন। কিন্তু অধিকাংশই পারছেন না। প্রচুর ধার দেনা করে ফ্রি ভিসায় মধ্যপ্রাচ্য গিয়ে গ্রামের তরুণটি দেখে তার চাকরি নেই। যে দালালের হাত ধরে সে বিদেশে এসেছে, সে পকেটে কয়েক দিনার ঢুকিয়ে দিয়ে সটকে পড়েছে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজে পরিবারের সঞ্চিত এবং কষ্টার্জিত ত্রিশ লাখ টাকা খরচ করে যে তরুণ চিকিৎসকটি বের হয়, তার চোখে মধ্যপ্রাচ্যে দালালের হাতে প্রতারণার শিকার হওয়া তরুণটির চাইতেও আমি বেশি অনিশ্চয়তা এবং হতাশা খেলা করতে দেখেছি। দালালটি অন্তত পকেটে কিছু টাকা গুজে দিয়ে যায়। বেসরকারি মেডিকেলের মালিকপক্ষকে আমি এর চেয়েও অমানবিক হতে দেখেছি। ডা. জাফরুল্লাহ সাহেবের গণস্বাস্থ্য মেডিকেল কলেজ থেকে যে তরুণটি ২৫ লাখ টাকা খরচ করে ডাক্তার হয়েছে, তাকে ইন্টার্নির সময় দেয়া হয় সাত হাজার টাকা। ইন্টার্নি শেষে লেকচারারদের বেতন বিশ হাজারের উপরে উঠেনা।

এই রাষ্ট্রের আরো কতো চিকিৎসক দরকার, কেনো এই দুরবস্থা চিকিৎসকদের, কিভাবে ব্যাংএর ছাতার মতো এতো বেসরকারি ( এবং কিছু সরকারিও) মেডিকেল গড়ে উঠে- এই প্রশ্নগুলো অনেক বিতর্ক তৈরি করবে, মন্ত্রীমশায় অনেক অনেক চোখ রাংগাবেন, লিজেন্ডারি অধ্যাপকরা সরকারি মেডিকেলে থাকা অবস্থায় বেসরকারি মেডিকেল থেকে পড়ে সরকারি মেডিকেলে অবৈতনিক ট্রেনিং করতে তরুণটির দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকাবেন, চুড়ান্ত অপমান করবেন এবং অবসর গ্রহণ করার পর একটা বেসরকারি মেডিকেলে প্রিন্সিপ্যাল হয়ে বসবেন। এসব বড় বড় বিষয় নিয়ে আসলে আমার আপনার কিছুই করার নাই। বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে চুড়ান্তভাবে গণবিরোধীরুপে গড়ে তোলা এবং মেডিকেল সেক্টরকে চুড়ান্তভাবে ধ্বংসের মুখোমুখি দাড় করিয়ে দেয়ার জন্য নীতিনির্ধারকদের আপাতত অভিশাপ দিই। কিন্তু আপনি আপনার সম্ভাবনাময় সন্তানটিকে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে কেনো এই অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড় করাতে চাচ্ছেন?
নচিকেতা নীলাঞ্জনার দুঃখে দাম দিয়ে যন্ত্রণা কিনে। আপনি ত্রিশ থেকে চল্লিশ লাখ টাকা খরচ করে সন্তানের জন্য এ কোন যন্ত্রণা কিনতে চান? লেখক: ডা. শরীফ উদ্দিন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) সার্জারি বিভাগে উচ্চতর ডিগ্রিতে অধ্যয়নরত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares