গোয়াল ঘরে শিকলে বাঁধা বৃদ্ধা মা, একবেলা খাবার দিতেন দুই ছেলে

বরগুনা সদর উপজেলার গৌরিচন্না ইউনিয়নের চরধুপতি এলাকার বাসিন্দা খবিরুন্নেসাকে (৭৫) মানসিক রোগী দাবি করে শিকল দিয়ে গোয়াল ঘরে আটকে রেখেছেন তার সন্তানরা।চরধুপতি এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথমে খবিরুন্নেসাকে গোয়াল ঘরে রশি দিয়ে বেঁধে রাখেন তার দুই ছেলে। একদিন রশি খুলে একমাত্র মেয়ের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিতে চাইলে ছেলেরা তাকে ধরে এনে একই স্থানে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখে। বয়সের ভারে কানে একটু কম শুনলেও খবিরুন্নেসা মানসিকভাবে স্বাভাবিক বলে জানান প্রতিবেশিরা। মূলত পৈত্রিক জমি-জমা ভাগ বাটোয়ারা হওয়ায় পরে ছেলেদের কেউ বৃদ্ধা মায়ের যত্ন নিতে রাজি নন। এ কারণে তাকে অবহেলায় গোয়াল ঘরে ফেলে রাখা হয়েছে প্রায় পাঁচ মাস ধরে। ওই গোয়াল ঘরেই দিনে একবার তাকে খাবার দেওয়া হয়।

গতকাল সোমবার রাত ১০টার দিকে ওই বাড়িতে গিয়ে বৃদ্ধা খবিরুন্নেসাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি গোয়াল ঘরে বিছানায় শেকল বাঁধা অবস্থায় দেখা যায়।গোয়ালঘরে লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে খবিরুন্নেসা পরিচয় জানতে চান। ছেলেদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনারা কারা বাবা? মোর পোলারা ভালো। হ্যারা মোরো ঠিকমতো খাওন-দাওন দেয়। মোর পোলাগো যেন কেনো সমস্যা না অয় বাবা।’ গোয়াল ঘরে শেকলে বাঁধা থাকলেও খবিরুন্নেসা তার সন্তানদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলতে চান না। ঠিক মতো তাকে খেতে দেওয়া হয় কী না জানতে চাইলে তিন সন্তানের জননী বলেন, ‘আমার পোলারা আপনাগো দোয়ায় মোরে ঠিকমতো খাওন দাওন দেয়। হ্যারা অনেক ভালো।’ কথা বলতে গেলে খবিরুন্নেসার ছোট ছেলে বাচ্চু জানান, তার মায়ের মাথায় সমস্যা আছে। তিনি বাইরে কাজে ব্যস্ত থাকেন। তার মা যেন কোথাও চলে না যায় তাই বেঁধে রেখেছেন। খবিরুন্নেসাকে ঠিকমতোই ভরণপোষণ করছেন বলেও জানান বাচ্চু।

প্রতিবেশী হুমায়ুন কবীর জানান, খবিরুন্নেসা দুই ছেলে ও তিন মেয়ের মা। দুই বছর আগে স্বামী আবদুল হামিদ খান মারা যাওয়ার পর সহায় সম্পত্তি ছেলে-মেয়েরা ভাগ করে নেন। মায়ের ভরণপোষণ নিয়ে ছেলেদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে এক বৈঠকে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের সহায়তায় দুই ছেলে মিলে ভরণপোষণ করবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু ছেলেদের কেউই ঠিকমতো মায়ের যত্ন নেননি। এছাড়া বিভিন্ন রোগে খবিরুন্নেসার শারীরিক অবস্থারও অবনতি হতে থাকে। বিভিন্নজনের কাছে খবর পেয়ে খবিরুন্নেসাকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করেন বরগুনা জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোস্তাইন বিল্লাহ। উদ্ধারের পর বরগুনা থানা পুলিশের কনস্টেবল রেজাউল গাজী খবিরুন্নেসাকে পরার জন্য দুটি জামা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, একটি পাটি ও সাবান কিনে দেন। পরে মেয়ে তসলিমার জিম্মায় দেওয়া হয় তার মাকে।

মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, ‘পুনরায় ছেলেরা যাতে তাদের মায়ের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ না করতে পারে তার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা বরগুনা জেলা প্রশাসন বৃদ্ধা মায়ের পাশে আছি। সেই সাথে তিনি যাতে তার ছেলেরা আর অবহেলা না করতে পারে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares