টাকা দিলে ৫ সেকেন্ডের পরীক্ষায় মেলে লাইসেন্স!

মাত্র ৫ সেকেন্ড। গাড়িতে বসে স্টিয়ারিং ধরে বসে থাকতে পারলেই পরীক্ষায় পাস। কয়েকদিন পর মেলে লাইসেন্স। সেই লাইসেন্স নিয়ে এসব চালক দাপিয়ে বেড়ান সড়কে। ঘটে দুর্ঘটনা।লাইসেন্স পাওয়া এমন শর্টকার্ট পরীক্ষার চিত্র যেন প্রতিদিনকার। সম্প্রতি সরেজমিন খিলক্ষেতের জোয়ারসাহারা গিয়ে দেখা মেলে দালাল দিয়ে লাইসেন্স নেয়ার অভিনব এ কৌশল। জোয়ারসাহারায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের লাইসেন্সপ্রত্যাশীদের পরীক্ষা নেয়া হয়।

জাগো নিউজের পক্ষ থেকে সরেজমিন পরীক্ষার্থী বেশে দেখা যায়, জোয়ারসাহারার ভেতরে পরীক্ষার্থীদের তিনটি লাইন। প্রথমটি লিখিত পরীক্ষার, দ্বিতীয়টি মৌখিক এবং তৃতীয়টি গাড়ি/মোটরসাইকেল চালানোর ব্যবহারিক পরীক্ষা। লিখিত পরীক্ষা মোট ২০ নম্বরের। এতে ১২ পেলে পাস। ১০০ নম্বর করে মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা হয়। মৌখিকে পাস নম্বর ৭৫। ব্যবহারিকে ১০০ তে ১০০ পেতে হয়।

তবে খিলক্ষেতে গিয়ে দেখা গেল উল্টো চিত্র। দালালের শরণাপন্ন হলে গাড়ি চালাতে না পারলেও পাস নম্বর পাওয়া যায়। খিলক্ষেতে ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য দুটি গাড়ি রয়েছে। পরীক্ষা দিতে গাড়ির ভাড়া দিতে হয় ১০০ টাকা। খোলা মাঠে লাল পতাকা বসানো। একজন পরীক্ষার্থীকে গাড়িটি ব্যাক গিয়ারে নিয়ে (পেছনের দিকে) পার্কিং করতে হয়। ব্যাকে নেয়ার সময় গাড়ির সঙ্গে লেগে কোনো পতাকা পড়ে গেলে পরীক্ষায় ফেল। তবে এক ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, দালালরা ১০০-১৫০ জনের লাইন ভেদ করে তাদের ‘গ্রাহককে’ ব্যবহারিক পরীক্ষা দেয়াচ্ছেন। অন্যরা ব্যবহারিক পরীক্ষায় পতাকা ফেলে দিলে তাদের ফেল করিয়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ দালালদের সঙ্গীরা গাড়িতে বসে পাঁচ সেকেন্ডের জন্য স্টিয়ারিং ধরেই পাস করে যাচ্ছেন। এমন দুজনকে পেয়েছে জাগো নিউজ।

এছাড়া এক ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে দালাল ছাড়া আগতদের মধ্যে মাত্র দুজনকে পাস করতে দেখা যায়। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের একজন এক বছর তিন মাস এবং আরেকজন এক বছর আগে আবেদন করেছিলেন।যারা দালাল ছাড়া সরাসরি গিয়ে পরীক্ষা দেন তাদের অনেকেই ফেল করেন। পরে তারা দালালের শরণাপন্ন হন। জোয়ারসাহারার উত্তর দিকে বিআরটিসির অনেকগুলো নষ্ট, ফিটনেসবিহীন ও আগুনে পুড়িয়ে দেয়া বাস রাখা হয়েছে। পরীক্ষায় ফেল করা আবেদনকারীদের সঙ্গে সেসব বাসের ভেতরে বসেই পাস করানোর ‘চুক্তি’ করেন দালালরা।

সাধারণত একটি ড্রাইভিং লাইসেন্স নেয়ার জন্য প্রাথমিকভাবে শিক্ষানবিশ লাইসেন্স নিতে হয়। এতে খরচ হয় ৩৪৫ টাকা। পরবর্তীতে পেশাদার চালকদের জন্য এক হাজার ৪৩৮ টাকা এবং অপেশাদার চালকদের জন্য দুই হাজার ৩০০ টাকা ফি দিয়ে পরীক্ষা দিতে হয়। অপেশাদারদের জন্য সবমিলে দুই হাজার ৬৪৫ টাকা লাগার কথা। তবে একাধিক দালালের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা মাত্র তিন মাসের মধ্যে সব ধাপ পার করিয়ে লাইসেন্স নিয়ে দেবেন। লাইসেন্সের আবেদনকারীকে শুধুমাত্র পরীক্ষার জন্য সশরীরে হাজির হতে হয়। বাকিটা তারাই দেখেন। এজন্য তারা আট থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকেন।

সম্প্রতি দালালের মাধ্যমে সাত হাজার টাকা দিয়ে লাইসেন্স নেয়া সগির হোসেন (ছদ্মনাম) জাগো নিউজকে বলেন, আমি ইকুরিয়ায় (কেরাণীগঞ্জ) প্রথমে মোটরসাইকেল এবং পরবর্তীতে গাড়ির জন্য আবেদন করি।মোটরসাইকেলের লাইসেন্সের সময় আমাকে ব্যবহারিক পরীক্ষায় একটি ‘জিগজ্যাগ’ (আঁকাবাঁকা) সড়ক পার হতে বলা হয়। তবে পরীক্ষার সময় মোটরসাইকেল থেকে মাটিতে পা নামানো যাবে না। তবে আমি যাকে (দালাল) টাকা দিয়েছিলাম সে বলেছিল সমস্যা নাই। আমি পাস করেছিলাম। মোটরসাইকেলের লাইসেন্স পাওয়ার কয়েক বছর পর আমি সেটার সঙ্গে হালকা যানের (গাড়ি) জন্য আবেদন করে এক দালালের সঙ্গে চুক্তি করি। পরবর্তীতে আমার আর ইকুরিয়া যেতে হয়নি। সেই লাইসেন্স করে আমাকে বাসায় পৌঁছে দেয়।

লাইসেন্স নেয়া আবরার নামে আরেকজন (ছদ্মনাম) জাগো নিউজকে বলেন, আমি খিলক্ষেতে পরীক্ষা দেই। এটি একটি ‘নামকাওয়াস্তে’ পরীক্ষা। আমি ‘হালকা যান’ চালানোর লাইসেন্স নেয়ার জন্য পরীক্ষা দিয়েছিলাম। সেখানে আমাকে একটি ম্যানুয়াল গিয়ারের গাড়ি চালাতে দেয়া হয়। আমার গাড়ি অটো গিয়ারের। ম্যানুয়াল গিয়ারে চালাতে পারতাম না। গাড়িটি ভাড়া নেয়ার জন্য আমাকে ৫০০ টাকা এবং না চালাতে পারায় ৫০০ টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়েছিল। মৌখিক ও লিখিত পরীক্ষায় পাস করতে না পেরে ১০ হাজার টাকায় লাইসেন্স করিয়েছিলাম। পরীক্ষার প্রতিটি ধাপেই তারা পাস করিয়ে দেয়।

আমানুল্লাহ আমান (ছদ্মনাম) নামে আরেকজন বলেন, ২০১২ সালে আমি লাইসেন্স করাই। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় যা জিজ্ঞাসা করে, সঠিক উত্তর দেই। ব্যবহারিকে বাইক ও গাড়ি কোনোটিই চালাতে হয়নি। তিন মাস পর লাইসেন্স পেয়েছি।সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, লাইসেন্সপ্রাপ্তির পরীক্ষা স্বচ্ছ করতে একটি বোর্ড গঠন করা হয়। সেই বোর্ডের প্রধান ঢাকা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী নাহিদ রসুল। কীভাবে দালালের শরণাপন্ন হয়ে অযোগ্যরা লাইসেন্স পাচ্ছেন- জানতে চেয়ে তার সরকারি নম্বরে সাতবার ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি রিসিভ করেননি। প্রতিবেদকের পরিচয় দিয়ে ম্যাসেজ দেয়া হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

শুধু রাজধানী নয়, ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতেও এভাবে বিনা পরীক্ষায় লাইসেন্স দেয়ার অভিযোগ আছে। আছে অতিরিক্ত অর্থ আদায়েরও অভিযোগ।জাগো নিউজের রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, সম্প্রতি স্থানীয় বিআরটিএ কার্যালয়ে গেলে সেখানে লাইসেন্স নিতে আসা চালকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ করেন অনেকে। অতিরিক্ত টাকা না দিলে নানা অজুহাতে হয়রানি করা হয়। রাজবাড়িতে লাইসেন্স করতে যাওয়া আনোয়ার তাকে বলেন, লাইসেন্সের জন্য বিআরটিএ অফিসে এসেছি। কিন্তু অনেক ভিড়। টাকা ছাড়া কাজ হয় না এখানে। চুক্তি করে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে লাইসেন্স করে দিচ্ছেন বিআরটিএর কর্মকর্তারা। যারা চুক্তি করেন না তাদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়।

লাইসেন্সপ্রাপ্তির প্রক্রিয়ার বিষয়ে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ইলিয়াস কাঞ্চন জাগো নিউজকে বলেন, রাষ্ট্রের সব জায়গায় দুর্নীতি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এ দুর্নীতি রোধে উদ্যোগ নিয়েছেন। এরই অংশ হিসেবে আপনারা দেখেছেন ইতোমধ্যে বিআরটিএ ও বিটিআরসি’র দুজন চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, এ সেক্টরে বিশাল একটা শয়তানের বটগাছ তৈরি হয়েছে। প্রথমে এ বটগাছের ডালপালা কাটতে হবে। পরে গোড়ায় হাত দিতে হবে। তবে লাইসেন্স যে প্রক্রিয়ায় নেয়া হোক না কেন, যদি রাস্তায় আইনের প্রয়োগ থাকে তাহলে তারা নিয়ম মেনেই গাড়ি চালাবে। আশা করছি, লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়াটাও ভবিষ্যতে স্বচ্ছ হবে।

এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ চেয়ারম্যান ড. কামরুল আহসান জাগো নিউজকে বলেন, আমরা অচিরেই দালালদের মাধ্যমে লাইসেন্স পাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করব। প্রতিটি পরীক্ষার স্পটে আমাদের মনিটরিং টিম রয়েছে, ম্যাজিস্ট্রেট আছে। আমরা সুপারভিশন অব্যাহত রেখেছি। ম্যাজিস্ট্রেটরা দেখে সাজা দেবেন।তবে খিলক্ষেতের পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রকাশ্যে দালালদের হস্তক্ষেপ দেখা গেছে। সেখানে কাউকে সাজা দেয়ার ঘটনা ঘটেনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares