পেঁয়াজের দামে লাগাম নেই: কেজি ২৪০-২৫০ টাকা

সরকারের নানা উদ্যোগের পরও পেঁয়াজের দামে লাগাম টানা যাচ্ছে না। ভোক্তারা এখনও আকাশচুম্বী দামেই কিনছেন পেঁয়াজ। পরিস্থিতি অনেকটা এমন যে, দাম কমাতে হাল ছেড়ে দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।এছাড়া প্রথম অবস্থায় বাজার তদারকিতে হাঁকডাক থাকলেও বর্তমান চিত্র পুরোটাই ভিন্ন। রাজধানীর বাজারগুলোতে বৃহস্পতিবার প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২৩০-২৪০ টাকা।আর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। গত ৩ দিন ধরে এ দামেই বিক্রি হচ্ছে। রাজধানীতে পাইকারি বাজারে দেশি ও আমদানি করা পেঁয়াজ প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ১৫০-২২০ টাকা। আর খুচরা বাজারে বিক্রি হয়েছে ২০০-২৪০ টাকা।

এদিকে গাজীপুরে একটি কর্মশালায় কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক সাংবাদিকদের বলেন, পেঁয়াজের চাহিদার তুলনায় আমদানি অপ্রতুল এবং মজুদে ত্রুটি থাকার কারণে দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বৃষ্টির কারণে উত্তোলনের সময় কৃষক মজুদ করতে পারেনি।এ কারণে বাজারে পেঁয়াজের ঘাটতি ছিল। সে প্রভাব পড়েছে বাজারে। এছাড়া ভারত পেঁয়াজ রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেবে আমরা বুঝতে পারিনি। এখানে আমাদের হয়তো ভুল থাকতে পারে।

আমাদের আগেই একটা জরিপ করা দরকার ছিল- কতটা উৎপাদন হয়েছে, কতটুকু আমরা আমদানি করব। তিনি এ সময় আরও বলেন, যে কোনো পণ্যের দাম নির্ভর করবে চাহিদা ও সরবরাহের ওপর।বর্তমানে পণ্যটির চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। তাই র‌্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ কোনো কিছু দিয়েই বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।১৩ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজের রফতানি মূল্য বাড়িয়ে ৮৫০ ডলার করার পর পণ্যটির দাম হুহু করে বেড়ে যায়। ঠিক তখন থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- দেশে পেঁয়াজের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। আমদানির চিত্রও ভালো।

দাম বাড়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এও বলা হয়েছিল, সিন্ডিকেটের কারসাজিতে দাম বাড়ানো হয়েছে। তাই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে দাম নিয়ন্ত্রণে আনা হবে। এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদফতর ও জেলা প্রশাসন বিচ্ছিন্নভাবে বাজার তদারকি জোরদার করে। এতে ২ মাসের মাথায় পেঁয়াজের দামও কিছুটা কমতে শুরু করে।সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সাংবাদিকদের বলেন, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে পেঁয়াজ আমদানি কম হয়েছে। যেখানে মাসে এক লাখ টন আমদানি হয়, সেখানে ২৫ হাজার টন আমদানি হয়েছে। এতে মাসে ৭৫ হাজার টন ঘাটতি থেকে গেছে।

তাই দাম কমছে না। তখন তিনি আরও বলেছিলেন, সমুদ্রবন্দরসহ আকাশ পথেও বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। এছাড়া দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজও বাজারে আসতে শুরু করেছে।তাই ১০ দিনের মধ্যে দাম কমে আসবে। কিন্তু দেখা গেছে, মন্ত্রীর একথার পরদিনই আবারও দেশি পেঁয়াজের দাম কেজিতে বেড়েছে ৪০-৫০ টাকা। আমদানি করা পেঁয়াজে বেড়েছে ৩০-৪০ টাকা।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার, রামপুরা বাজার, নয়াবাজার ও মালিবাগ কাঁচাবাজার বৃহস্পতিবার ঘুরে খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এদিন প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২৩০-২৪০ টাকায়। যা ৩ দিন ধরে একই দামে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া আমদানি করা মিয়ানমার ও মিসরের পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকা কেজি।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, পেঁয়াজের সংকটকে পুঁজি করে অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, আমদানিকারক, আড়তদার, মজুদদার ও খুচরা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি করে ভোক্তাদের পকেট থেকে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সরকারি উদ্যোগের পরও পেঁয়াজের সরবরাহ পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। মূল্য এখনও ক্রেতাদের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে।নয়াবাজারে পেঁয়াজ কিনতে আসা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, মনে হচ্ছে পেঁয়াজের দাম কমাতে সংশ্লিষ্টরা হাল ছেড়ে দিয়েছে। বাজারেও মনিটরিং আগের মতো নেই।

বিক্রেতারাও যে যেভাবে পারছে পেঁয়াজ বিক্রি করছে। দেখার যেন কেউ নেই। তিনি আরও বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ভুলের কারণেই আমাদের মতো সাধারণ ভোক্তারা পণ্যটি কিনতে হিমশিম খাচ্ছে। তারা আগে থেকে হিসাব রাখলে নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যটির দাম বাড়ত না।মজুদ কত আছে, আমদানি কত করতে হবে, এটা তাদের হিসাবে রাখা উচিত ছিল। যা তারা করেনি। ফলে তাদের ভুলের মাশুল আমাদের গুনতে হচ্ছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়র যুগান্তরকে বলেন, পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত বাজার তদারকি অব্যাহত আছে।
অধিদফতরের পক্ষ থেকে পেঁয়াজের আড়তে আমরা ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করছি। কোনো অনিয়ম পেলেই শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে।

এদিকে রাজধানীর পাইকারি আড়ত শ্যামবাজার ও কারওয়ান বাজার ঘুরে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২২০ টাকা দরে। মিয়ানমার ও পাকিস্তান থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ ১৭০-১৮০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। এছাড়া মিসর ও চীনের পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ১৫০ টাকা দরে।এদিকে বরিশালে ২ দিন টিসিবির পক্ষ থেকে ন্যায্যমূল্যে পেঁয়াজ বিক্রির পর তা বন্ধ আছে। বানারীপাড়ার বাজারগুলোতে পেঁয়াজের সরবরাহ কম। এতে পণ্যটির সংকট দেখা দিয়েছে। যাও পাওয়া যাচ্ছে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

বরিশাল ব্যুরো জানায়, মাত্র দু’দিন বরিশাল নগরীতে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে। এ সময় প্রতি কেজি ৪৫ টাকা দরে বিক্রি হয়। লাইনে দাঁড়িয়ে অনেক ক্রেতা পণ্যটি ন্যায্য মূল্যে কিনেছেন। তবে এ অঞ্চলে টিসিবির সরবরাহকৃত পেঁয়াজ ফুরিয়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।অন্যদিকে টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রির প্রভাবে বরিশালের পাইকারি ও খোলা বাজারে পেঁয়াজের দাম কমে আসতে শুরু করেছিল। সোমবার হঠাৎ করে টিসিবির বিক্রি বন্ধে সেই দাম বেড়ে ২৫০-২৭০ টাকায় গিয়ে পৌঁছায়।

বানারীপাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধি জানান, প্রতিদিনই এ অঞ্চলের বাজারগুলোত পেঁয়াজের সরবরাহ কমছে। এতে করে পেঁয়াজ সংকট দেখা দিয়েছে। তবে যেখানে পাওয়া যাচ্ছে বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকা কেজি দরে।সম্প্রতি ভারত থেকে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের পর ব্যবসায়ীরা কম খরচে মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি করেন। পরে ব্যবসায়ীরা বাজারে প্রতিকেজি ২৪-২৫ টাকার পেঁয়াজ পাইকারিতে ৬০-৬৫ টাকায় বিক্রি করেন।

ওই সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে ব্যাবসায়ীদের জেল-জরিমানা শুরু করে। ফলে বর্তমানে ব্যবসায়ীরা জেল-জরিমানা ও গ্রেফতার এড়াতে পেঁয়াজ আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। এতে সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে বাজারে পণ্যটি বেশি দরেই বিক্রি হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares