ভয়াবহ আকারে বেড়ে গেছে র‍্যাগিং, করণীয় কী?

আমার চেম্বারে আজ এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স পড়ুয়া ছাত্রকে নিয়ে তার বাবা-মা হাজির। সমস্যা হলো, সে পড়ায় মনোযোগ দিতে পারছে না।এবার বাড়ি ফিরে এসে সে বলছে আর যাবেই না সেখানে। কারণ জিজ্ঞেসের পর সে ভয়াবহ র‍্যাগিং এর ঘটনা বললো। ছাত্রটি কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব নিয়েএকটি মেস বাড়িতে ভাড়া থাকে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন বড় ভাই এসে বলে তোমরা নতুন এসেছো তাই আজ সন্ধ্যার পর আমাদের মেসেআসবে। কিছু নিয়ম-কানুন শেখানো হবে। না গেলে সমস্যা হতে পারে তাই ভয়ে তারা তাদের রুমে যায়।

যাওয়ার পর একজনকে বলে সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো। কিছুক্ষণ পর একজন বড় ভাই পেছন দিক থেকে এসে সামনে দাঁড়ায়। যে আগে নির্দেশ দিয়েছিল সে বলে তুমি বড় ভাইকে আসার সময় সালাম দাওনি তাই তোমার শাস্তি হলো ৫০ বার পুশ আপ( বুকডন)।ভুক্তভোগী ছেলেটি আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলার চেষ্টা করে- ‘উনি (সিনিয়র) তো পেছন দিক থেকে এসেছেন তাই দেখতে পাইনি’।এবার বড় ভাই ধমক দিয়ে বলেন- ‘তোমাকে ১৮০ ডিগ্রি এঙ্গেলেও দেখতে হবে’।এভাবে চলতে থাকে নানা কায়দায় অত্যাচার। কিছুদিন চলার পর ওরা কয়েকজন মিলে প্রতিবাদ স্বরূপ একদিন ওদের ডাকে সাড়া দেয়নি। পরে বড় ভাইএবং তাদের ক্যাডার বাহিনী এসে সেই ছাত্রদের মেসে এসে বেধড়ক পিটিয়ে চলে যায়। এই ভয়েই সে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চায় না।এবার ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করি, তোমাদের শিক্ষকদের কাউকে বলোনি এই ঘটনাগুলি? সে বলে স্যাররাও তো তাদের ভয় পায়?

-কেন?সে জবাব দেয় ওরা রাজনৈতিক বড় বড় নেতাদের সঙ্গে ঘোরাফেরা করে। পুলিশ এবং প্রশাসনের লোকজনও তাদের খাতির করে। এবার বাবা-মাকেজিজ্ঞেস করি, ওর বিশ্ববিদ্যালয়ে কি কখনো গিয়েছেন? ওদের পরিবেশ কেমন? ওদের সমস্যা কি এসব ব্যাপারে শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন?অভিভাবকদের উত্তর হলো-‘ছেলে তো বড় হয়েছে, তাই ব্যস্ততায় যাওয়া হয়নি। ওকে মারার খবর শুনে যাই’।সমাধান: কারো একার হাতে এই সমস্যার সমাধান নাই।ছাত্র-ছাত্রী: জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক ফিটনেস, মুক্তবুদ্ধি চিন্তা, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান, দেশপ্রেমের কাজে নিজেদের নিয়োজিত রাখতে হবে। অভিভাবক: ছেলেমেয়ে স্বাবলম্বী না হওয়া পর্যন্ত তাদের খোঁজখবর রাখতে হবে। নিজেদের বদ স্বভাবগুলি। পরিবর্তন করার চেষ্টা করতে হবে। দেশকে

ভালোবাসতে শেখাতে হবে। শিক্ষক: নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ছাত্রদের ওপর চাপিয়ে দেবেন না। নিজেদের সন্তানদের জন্য শিক্ষকদের কাছে যা আশা করেন তাই করার চেষ্টা করুন। মেরুদণ্ড সোজা করুন। আল্লাহ তায়ালা যে জ্ঞান আপনাকে দিয়েছেন তা দিয়ে ভালোভাবেই চলতে পারবেন ইনশাআল্লাহ। অন্যায়কে অন্যায় বলুন।

রাষ্ট্র, পুলিশ, প্রশাসন: যে আগুনে অন্যের ঘর পুড়েছিল, পুড়ছে, পুড়বে তা দিয়ে আপনার কোন না কোন জ্ঞাতি-গোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই ভেবে চিনতে কাজ করুন। সরকারি দল, বিরোধী দল মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। দেশকে সত্যিকারে ভালোবাসুন। অন্যায় দিয়ে অন্যায়ের বিচার করবেন না। বিরোধী দল, মতকে নিঃশেষ করে দেবেন না। তাহলে, এই দেশে অন্যায় অনাচারের প্রতিবাদ করার আর কেউ থাকবে না। ফ্রাংকেস্টাইন আপন পর চেনে না।বিরোধী দল: দেশকে সত্যিকারে ভালোবাসুন। সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করুন। অন্যায়, অত্যাচারের নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদ করুন।

লেখক: ডা. মো. জোবায়ের মিয়া
সহকারী অধ্যাপক, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares