সুখ, দুঃখ ছাড়া জীবন সুন্দর হতে পারেনা

মাঝরাতে আজ ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘুম আর হবে না মনে হচ্ছে। মারিয়া (আমার স্ত্রী) সেও জেগে আছে কিন্তু কোন সাড়াশব্দ নেই। দুজনই ভাবছি চুপি চুপি। আশ্চর্য! কথা বলতেই জানলাম, সে যা ভাবছে আমিও ঠিক তাই ভাবছি। গতকাল রাতে জনাথানের (আমাদের ছেলে) সঙ্গে কথা হয়েছে। অক্টোবরের ২৮ তারিখ থেকে নভেম্বরের ২০ তারিখ অব্দি সে সুইডেনের বাইরে টেনিস ট্যুরে থাকবে। প্ল্যান করেছে তার প্রথম অপশন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের নেপলস, অরল্যান্ডো এবং পরে ক্যালিফোর্নিয়ার মালিবু। দ্বিতীয় অপশন জার্মানীর হামবুর্গ, কাতারের দোহা এবং কুয়েতের মেশরেফে (Meshref) খেলবে। আজ সকাল ১২টার মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোথায় যাবে। বিভিন্ন বিষয়ে গতকাল সন্ধ্যায় আলোচনা করেছি কিন্তু ফাইনাল সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারিনি। আমি এবং আমার স্ত্রী ছেলেকে নিয়ে ভাবছি, দুজনে দুজনার মত করে। জনাথান তার এটিপি টেনিস ওয়ার্ল্ড ট্যুরে সাধারণত নিজের মত করে প্ল্যান করে।

এবার কেন যেন আমি এবং মারিয়া দুজনেই আপত্তি করছি আমেরিকা না যেতে। যার কারণে গতকাল সন্ধ্যায় আমাদের আলোচনা হয়। জনাথান কখনও আমাদের মতের বাইরে কিছু করেনা। তাই আমাদের সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেয় যে সে ইউরোপ এবং এশিয়াতেই থাকবে অক্টোবর এবং নভেম্বর মাস। এখন প্রশ্ন হলো এতে সমস্যা কোথায়? সমস্যা নয় তবে মনের গভীরে আমরা দুজনেই ভাবছি আমাদের প্রভাবিত সিদ্ধান্ত জনাথানের জন্য ভালো হয়েছে কিনা! বাবা-মার ভূমিকা সন্তানের জীবনে যে কত গুরুত্বপূর্ণ যা আগেই জানতাম যখন দেখেছি আমার বাবা-মাকে। বাবা হবার পর অনেক কিছুই খেয়াল রাখতে হয়। যেমন তাদের (সন্তানদের) পছন্দ মত সব করতে চেষ্টা করা। আবার শক্ত হয়ে কখনও তাদের পছন্দকে নিষেধ করা। সংসারের অন্যান্য দায়িত্বও পালন করা। তারপর নিজের পরিবারের বাইরে রয়েছে যেমন ভাইবোনদের খবরাখবর রাখা এবং প্রয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া।

তাছাড়াও সমাজ এবং নিজ দেশের কথা ভাবা। এসব কিছু মিলেই আমাদের জীবন। এমন একটি জীবনের আশা সব মানুষই করে সারা পৃথিবীতে। কিন্তু সবার ভাগ্যে এমনটি সুযোগ সবসময় আসে না। অনেকের সুযোগ হয়েছে কিন্তু তার সদ্ব্যবহার হয়নি।আবার কারো পরিবারে সুযোগই আসেনি একাকি থাকার কারনে। সুইডেনের কথাই বলি, যারা ফ্যামিলি লাইফের সঙ্গে জড়িত তারা সত্যিই ফ্যামিলি নিয়ে ভাবে। ছেলে-মেয়েকে ঘিরেই তাদের সব কিছু হয়ে থাকে। বিশেষ করে তাদের বয়স ১৮ বছর হবার আগ পর্যন্ত বাবা-মার ভূমিকা অপরিসীম। এখন আবারও প্রশ্ন তাহলে কি বাবা-মা তাদের প্রতিচ্ছবি দেখতে চায় সন্তানের মাঝে? সুইডিশদের পক্ষ থেকে বলব এর উত্তর না।

কারণ এখানে সন্তান নিজে কি হতে চায় তার উপর গুরুত্ব দেয়া হয় জোরালোভাবে। যেমন আমি বা আমার স্ত্রী স্পোর্টসে কখনও আসক্ত ছিলাম না, কিন্তু ছেলে-মেয়ে দুজনই স্পোর্টস বেছে নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের মোটিভেশন এবং ডেডিকেশন ১০০% তাদের সাফল্যের জন্য। আবার অনেক সময় দেখা যায় সন্তান বেছে নেয় বাবা-মার পেশা। অনেকের ধারনা তাহলে তো ভালো, কষ্ট কম হবে বা সহজ হবে সাফল্য পেতে। কিন্তু না, সব সময় এ সিদ্ধান্ত শত ভাগ ঠিক নয়। অনেক সময় বাবা-মার একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর পারদর্শীতা থাকার কারণে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহন বা জড়িত হওয়াটা এবং দ্রুত সন্তানের দরকারে সাহায্য করার প্রবনতা বেশি দেখা যায়। যার কারনে সন্তানের নিজের চিন্তাশক্তি লোপ পায়। অতএব সংক্ষেপে বলা যেতে পারে সুযোগ সুবিধা বেশি থাকা বা একেবারেই না থাকা, দুটোতেই ভালোমন্দ রয়েছে।

এক্ষেত্রে বাবা-মার ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হবে। শিশু যেমন হাঁটতে পারে না যদি সে আছাড় না খায়, আবার মা শিশুকে বুকের দুধ দেয়না যদি শিশু না কাঁদে। আমি বেশ প্রকৃতিকে অনুকরণ করি। কারণ প্রকৃতি থেকে জীবনের অনেক শিক্ষনীয় রয়েছে। তাই কঠিন সমস্যায় প্রকৃতির সঙ্গে মেলামেশা করে অনেক সমস্যার সমাধান পেয়ে থাকি। সমস্যা আছে, সমস্যা থাকবে। অতএব সমস্যাকেই সঙ্গে রেখে বেঁচে থাকার মাঝে আনন্দ খুঁজে নিতে হবে। আজ বিছানা থেকে উঠে ব্যালকনিতে গিয়ে নীল আকাশের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রয়েছি। হঠাৎ একখানা মেঘ ভেসে এসে নীল আকাশকে অন্ধকারে ঢেকে দিল। মেঘ বাতাসে সরে যাবে বা বৃষ্টি হয়ে ঝরে যাবে, আবার আকাশ নীল হবে। আমাদের জীবনেও ঠিক তেমনি করে দুঃখ, কষ্ট এবং বেদনা আসবে আবার তা কেটে যাবে। ভাবছি জীবন কি আসলে এত সুন্দর হতো যদি একটুও সমস্যা না থাকতো!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares